গল্প: মধ্যবিত্ত
লিখা-- মেঘ
ডেডিকেটেড -- মায়াবী মায়া ``
-----
ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর সেখানেই থাকতে হবে বুঝলাম!! মেসের জীবন কেমন তা নিয়ে বেশ চঞ্চল ছিলাম! আমি তো বাবা-মায়ের এই ঘর ছেড়ে কখনও দূরে থাকিনি! তাহলে আজ কিভাবে থাকবো?? বেশ ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম! আমি পুরুষ সারাজীবন তো আর ঘড়ে থাকা আমার মানাবে না! তাই মেসে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম!! বইয়ের দোকানদার আমাকে খুব স্নেহ করতেন! উনার কাছে বলতেই উনি একটা ব্যবস্থা করে দিবেন বলল!! তারপর যা যা লাগে নিয়ে যেতে বলল......
----
আমি মেঘ! এবার অনার্স ১ম বর্ষ! বাবা কৃষক! আম্মা গৃহিণী! ঘড়ে একটা বোন আছে আমার এইবার ক্লাস ৫ এ পড়ে! এই আমাদের পরিবার!! যেদিন বাসা থেকে চলে আসছিলাম! আমার বোনটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছিল আর বলছিলঃ- দাদা আমাকে রেখে চলে যাবি? আবার কবে আসবি দাদা?? আমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসবি বুঝলি দাদা?? তাছাড়া আম্মাও মুখে আচল নিয়ে হাল্কা কান্না করে বলছিলঃ- সাবধানে থাকিস মেঘ! আর শহরে দেখেশুনে থাকিস! খারাপ ছেলেদের সাথে একদম মিশবি না! আর নামাজ পড়বি ৫ওয়াক্ত তাহলে তুই যা বলবি আল্লাহ তাই করবে...... শুনেক বাবা ভালো করে মন দিয়ে লিখালিখি করবি!!
----
এরপরে যা যা লাগে মেসে থাকতে! সবকিছু একটা ভ্যানে করে বেড়িয়ে পড়লাম!! আজ প্রথম আত্নীয়দের বাড়ি ছাড়া রাত কাটাবো!! বিশেষ করে যখন আমার পাগলী বোন লতা কাঁদছিল তখন সবথেকে বেশি মায়া লাগছিল! বাড়বার ওর মুখটা চোখে ভাসছিল.......
-----
এরপরে মেসে পৌছে গেলাম!! ওখানকার কিছু ভাইয়ারা আমাকে রুম দেখিয়ে দিলো য উনারা আমাকে সাহায্য করল বেশ! তারপর আমি রুমে সবকিছু সাজিয়ে রাখলাম.... সেইদিন রাত ১০ লেগেছিল রুম ঠিক করতে..... এরপরে একজন খাবার দিয়ে গেলো! সবায় উনাকে দেখলাম খালাম্মা ডাকছিল! শুনে আমিও খালাম্মা ডাক দিলাম! আমার ডাক শুনে উনি তাকিয়ে থাকলো! তারপর কাছে এসে বলল কিছু লাগবে?? আমি বললাম না, তবে চাউল কিভাবে দিতে হয়? উনি বলল কাল এসে নিয়ে যাবো আমি!! তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে যাও..... তারপর খেলাম! বাসায় ফোন করে বললাম মা আমি ভালমতো পৌছে গেছি তুমি টেনশন করোনা! পরী ঘুমিয়ে গেছিলো আমার কন্ঠ শুনেই লাফ দিয়ে বললঃ- দাদা তুই কী একা একা ঘুমাবি?? আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি না?? শুনে বুকটা হু হু করে উঠলো!! তারপর বললাম দিবোতো পাগলী বাড়ি যখন আসবো তখন দিবো! এখন লক্ষী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে যা....... তারপর আমিও ঘুমোতে গেলাম......
-------
চলছিল এইভাবেই দিন! আম্মা যা টাকা দিয়েছিল তা দিয়ে চলে যাচ্ছিল! তারপর সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে নামাজ, তারপর খাবার খেয়ে ক্লাস করা! বিকালে পড়তে যাওয়া ছিলো কাজ! আর নামায পড়া কখনওই বাদ দিতাম না!! যেদিন খুব ব্যস্ত থাকতাম সেদিন কেবল পরে কা'জা নামাজ পড়ে নিতাম!! দিনগুলো কেমন যেন দ্রুত কেটে যাচ্ছিল!! ক্লাসে একাই থাকি সবসময়! আম্মা বলেছিল কারও সাথে বন্ধুত্ব না করতে!! তাই যখন একা লাগতো তখন ডাইরি লিখতাম!! লিখলাম লতার কথা! কবে বাড়ি যাবো সেসব কথা!! যখন লিখতাম খুব হাসি পেতো লতার কথা ভেবে! আবার মাঝেমাঝে খুব মন খারাপ হতো লতার আর বাবা-মা'র কথা ভেবে..... তবুও এইভাবেই থাকতাম!! বন্ধুত্ব কী জিনিস আমার জীবনে কখনওই আসেনি! কারণ গুলো পরেই বলি.....
----
এরপরে দোকানদার ভাইয়া তার মেয়েকে পড়াতে বললেন আমাকে!! শুনে আমিও আর দ্বিমত করিনি! কাছেই বাসা! সন্ধায় যেয়ে পড়িয়ে আসা ১৫০০ টাকা মাসে দেবে বলল!! ক্লাস ৪ পরে দেখতে লতার মতো নয়! তবে ওর মাঝে আমি লতাকে খুঁজতাম!! আমার এই ছাত্রীর নাম তন্নি!! দেখতে সুন্দর!! মাঝেমাঝে দুষ্টামি করলেও আমি কিছুই বলতাম না! কারণ আমি লতাকে কখনওই মাড়তাম না!! আম্মা লতাকে মাড়তে এলেও আমি থামিয়ে দিতাম! লতা তখন আমার বুকে মুখ লুকাত......!! ওরজন্য যেমন চকলেট নিয়ে যেতাম! তেমনি তন্নির জন্যও নিয়ে যেতাম..... ভাইয়া মেয়েকে নিজের মেয়ে ও বোনের নজরে দেখতাম কারণ আমার ঘড়েও এমন একটা বোন আছে তাই ভেবেই পড়াতাম......
----
প্রায় ২ মাস কেটে গেলো! ভার্সিটি ছুটি দিলো আমিও ভাবলাম এইবার বাসায় যাবো! কতদিন বাড়ি যায়না!! যখনি ভাবলাম বাড়ি যাবো ঠিক তখুনি আমার লতার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে এলাম! শহরে সবকিছুর এতো দাম! লতার জন্য একটা জামাতে হাত দিয়েছি দোকানদার বলল ৫ হাজার টাকা! আমার পকেটে আছে মাত্র ২ হাজার টাকা..... আরেকটা যখুনি ধরেছি দোকানদার বলল ৩ হাজার টাকা!! শুনে ভাবলাম এসব আমাদের জন্য নয়!! গ্রামের বাজার থেকেই কিনবো!!
-----
তন্নিকে ৪ দিনের ছুটি দিলাম! এরপরে বাড়ির দিকে এগোলাম!! আসার পথে পকেটে হাত দিয়ে দেখি ১ হাজার টাকা পকেটমার কখন যে তুলে নিয়েছে বুঝতেই পারেনি!! মন টা খুব খারাপ হলো!! আর কাছে আছে মাত্র ১০০০ টাকা টাকা!! গ্রামের বাজারের দিকে এগোলাম! সেখানে যেয়ে পাগলীর জন্য কিছু পুতুল চকলেট খেলনা এসব নিলাম!! তখন আছে আর ৬০০ টাকা!! সেটা থেকে আম্মার জন্য ১৫০ টাকা দিয়ে একটা উড়না নিলাম! বাকী থাকলো আর ৪৫০ আব্বুর জন্য একটা লুঙ্গি নিলাম ৩০০ টাকা দিয়ে! এরপরে ১৫০ টাকা নিয়ে বাড়ির দিকে গেলাম.......
----
বাড়িতে লতা আমাকে দেখে খুব খুশি হলো! লতার খুশি দেখে আমার কলিজা শীতল হয়ে যাচ্ছিল...... এরপরে বাবা কে লুঙ্গি! আর মা কে উড়না দিলাম! তাদের মুখে একটা হাসি দেখেছিলাম! সেই হাসিটা বুক পকেটে রেখে দিলাম যত্ন করে....
-----
তারপর স্বাভাবিক ভাবে লতার সাথে দুষ্টুমি করেই কাটছিল দিন.... লতার সাথে পুকুরে গোসল করা! বড়শি দিয়ে মাছ ধরা!! রাতে লতাকে গল্প পড়ে শোনানো! তারপর আমার ছাত্রীর গল্প বলা! ভার্সিটির গল্প বলা এসব করেই ৩ দিন শেষ..... তারপর ছুটিও ফুরিয়ে এলো!! তারপর আবার সেই বেদনাময় বিদায়!! লতা এইবার আমাকে একটা রুমাল দিলো! সেখানে লিখা ছিলো ( মেঘ ভাইয়া) দেখে হেসেই দিলাম! লতা বললঃ দাদা আমার কথা যখন তোর মনে পড়বে তখন কিন্তু তুই এইটা দিয়ে মুখ মুছবি! আর আমাকে দেখতে পাবি হিহিহিহি / শুনে আমিও হেসেদিলাম!! লতার সাথে কত যে পুতুল খেলেছি তার হিসাব যেন নেই.......
------
মেসে এলাম আবার আগের মতো ব্যস্ততা.... ক্লাস কর, বাসার কাজ, টিউশনি এসব নিয়েই দিন কেটে যেতো....... পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম আর ১০০ টাকা আছে....... এদিকে আজকে মাসের ২২ তারিখ.... এখনো আট দিন কিভাবে যে চালাই বুঝতে পারছিনা.... এখনো ৮ দিন...... সকালে যখন ব্রাশ করতে গেলাম দেখি টুথপেস্ট ফুরিয়ে গেছে!! বাজার থেকে একটা নিয়ে এলাম! এবার দেখলাম দাড়ি,গোফ কাটার দরকার পকেটে নেই টাকা কি যে করি!! এরপরে একটা ব্লেড দিয়ে ৩ টা কাজ সারলাম.......!! টাকা না থাকলে আসলে বোঝা যায় জীবন কী......!! এরপরে দিন পর শ্যাম্পু দেখলাম ফুরিয়ে গেছে! ২টাকার শ্যাম্পু দিয়ে ৬ দিন কাটিয়েছিলাম!!
---
আর তাছাড়া আমার সবকিছু খুব কম কম যেমন জামা মাত্র ১টা! প্যান্ট দুইটা! ১টা গেঞ্জি!! ২জোড়া চটি জুতা!! এছাড়া আমার জাঙ্গিয়া ও বেল্ট ১টা করে! মানে একদিন ধুয়ে দিলে না শোকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে আমাকে। তবুও আমি হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করি সবসময়.......
---
অনেকেই আমাকে বলে আমি নাকি কৃপণ! আসলে আমি কৃপণ নয়, ওসব কিনতে টাকা লাগে যা আমার নেই!! বিলাসিতা সবার জন্য নয়!! ধনীদের জন্য কেবল তৈরি বড়বড় অট্টালিকা আর আমাদের জন্য কুড়ে.... আচ্ছা কেন এই বৈষম্য? কেন এতটা ব্যবধান?? আমি কৃপণ নয়! টাকার অভাবে আমি আজ মেপে মেপে চলি......
----
একদিন খালাম্মা আসেনি, সেদিন মেসে খাবার ছিলোনা! আমাকে শুধু পানি খেয়ে কাটাতে হয়েছিল! তবে মাঝরাতে যখন লতা হঠাৎ ফোন করে বলছিলঃ- দাদা তোকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছি রে, তুই ভালো আছিস তো?? ঠোটের কোনে জোড় করে একটা হাসি এনে বললাম হ্যা রে পাগলী আমি ঠিক আছি! চিন্তা করিস না, ঘুমিয়ে যা তুই.......
-----
একদিন দুপুরবেলা ভিষন খুধা লাগে পকেটে নেই টাকা! আবার দুপুরের পর ক্লাস টেস্ট কি যে করি!! তখন দুই গ্লাস পানি খেয়ে পরিক্ষা দিয়ে এসে ভাত খেয়ে যেন জীবন বাচে!! আচ্ছা জীবন কী দু মুঠো খাবারের জন্য??? সেদিন ভেবেছিলাম!! মেস থেকে ভার্সিটি তে যেতে ১০ টাকা লাগে! আমি হেটে যাবো নাকি রিক্সায়?? ভাবতে ভাবতে হেটেই যায়! কারণ আমি মধ্যবিত্ত ঘড়ের ছেলে!! আর বাবা কৃষক বাবা কিভাবে টাকা দেবে আমাকে?? কোথায় পাবেন উনি??? এটাই বাস্তবতা যে জীবনে টাকার খুব গুরুত্ব আছে.........!!
----
→ পকেটে ১০ টাকা বুকে হাজারটা স্বপ্নের নাম মধ্যবিত্ত
→ পেটে খুধা তবুও মুখে মিথ্যে হাসির নাম মধ্যবিত্ত
→ এক জামা প্রতিদিন গায়ে দেওয়া, ঘেমে গেলে শুকাতে দিয়ে অপেক্ষার কখন শুকাবে এর নাম মধ্যবিত্ত
→ খুধার জন্য বাড়বার পানি খেয়েও ঘুমাতে চেষ্টা করার নাম মধ্যবিত্ত
→ জীবনে কী করব ভেবেভেবে নির্ঘুমের নাম মধ্যবিত্ত
→ একদিন কী আমি বাবা কে খুশি করতে পাড়ব ভাবার নাম মধ্যবিত্ত
→ ছোট বোনটা বিয়ের উপযুক্ত ঘড়ে টাকা নেই বাবার উনুপার্জনশীল সব দায়িত্ব কাধে কিন্তু আমার পকেটে টাকা না থাকার নাম মধ্যবিত্ত
→ জীবনে দামি রেস্টুরেন্ট বা শপিং মলের পাশ দিয়ে যাওয়া কিন্তু ঢুকতে লজ্জা পাবার নাম মধ্যবিত্ত
→ বাবার চোখের নিচে কালো দাগ, আর মা'য়ের চিন্তা কবে আমি চাকরি পাবো? আমাদের কোন মামা-খালু নেই এসব ভাবার নাম মধ্যবিত্ত
→ জীবন থেকে পালিয়ে বাচার নাম মধ্যবিত্ত
→ দামি মোবাইল বা দামি বাইক দেখে একটা দীর্ঘশ্বাসের নাম মধ্যবিত্ত
→ কী পাপ ছিলো জন্ম যখন মধ্যবিত্ত???
→ আজ কেন আট দশটা ছেলের মতো বিলাসিতা করে জীবন পার করতে পারবোনা?? যেখানে বাবা মা কে কেউ খুশি করতে পারেনা সেটাকে কী জীবন বলে???
--- জীবন মানে কী?? নির্ঘুম প্রতিটারাত?? জীবন মানে কী মিথ্যে হাসি?? জীবন মানে কী হতাসা আর একগুচ্ছ আকাশছোঁয়া স্বপ্ন??
_______
হ্যা আমিও মানুষ আমারো ইচ্ছা করে গফ থাকতে! কিন্তু আমি তো ফকিরের বাচ্চা!! আমি নিজেকে ভিক্ষুক মনে করি! আমার কী গফ থাকতে আছে?? ফকিরের কী গফ থাকতে আছে?? আসলে মেয়েরা টাকা কে নয় মেয়েদের সাথে চলতে হলে টাকার প্রয়োজন যা আমার নেই!! আর টাকা ছাড়া এই যুগে কী হয়?? টাকা ছাড়া এইযুগে কী এমন আছে????
---
আমারো ইচ্ছা করে যখন বাড়িতে আসবো তখন বাবার জন্য লুঙ্গি গেঞ্জি! মায়ের জন্য মেক্সি উড়না! আর লতার জন্য ছোট্ট শাড়ি চুড়ি, আর পায়েল টিপ সহ অনেক কিছু নিয়ে আসি..... আমার ইচ্ছা আছে! আমার স্বপ্ন আছে.....!! আমার মন ও আছে..... শুধু নেই টাকা.......
কারণ আমি মধ্যবিত্ত..... মধ্যবিত্ত...... আর মধ্যবিত্ত.... কারণ আমি অভিশপ্ত...........
____________মেঘ___________
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন