"জোৎস্না ও নিশি কন্যা"
-
-
ছেলেটির জোৎস্না দেখতে খুব ভাল লাগত। প্রতি রাতেই একা একা ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্ঘুম কাটিয়ে দিত, কোনো অবসাদ বোধ কাজ করত না হ্রদয়ে। সময়টা তখন খুব রোমাঞ্চকর লাগত। কিন্তু তার জোৎস্নায় সঙ্গী হওয়ার মানুষটি অার ছিল না, রোমাঞ্চকর রাতটাকে ভাগ করে নিতে সে তার কল্পনার অপ্সরীকে ওই জোৎস্নাতেই খুঁজে বেড়ায়৷ কোনোদিন হয়তবা তার কাছে সত্যিই অাবার ধরা দিবে, এই ভেবেই প্রতিটা রাত সে কাঁটিয়ে দিত। কিন্তু অপর পাশের মানুষটি আর ফিরে আসে না। আসবেই বা কিভাবে? সে তো না ফেরার দেশে চলে গেছে। সেখানে যাওয়া যায় কিন্তু আর ফেরা যায় না।
..
..
..
এমনই এক জোৎস্নাস্নাত রাতেই মেয়েটির সাথে পরিচয় হয়েছিল তার। এখনো মনে আছে- ওই রাতে আকাশে অনেক তাঁরা উঠেছিল। হয়তো তাঁরাগুলোও নতুন কিছুর সাক্ষী হবার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল।
,,
,,
ওর গায়ে একটি সাদা আলখেল্লা পড়নে ছিল। ওড়না ছিল না, পাজামাটাও হয়তবা সাদা ছিল। কিন্তু ছেলেটির চোখে শুধু এতটুকুই পড়লো। অবশ্য ভাল লাগার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। মেয়েটি এসেছিল নিজেকে শেষ করতে৷ এই পৃথিবীর মায়া কাঁটিয়ে ওই ওপাড়ে চলে যেতে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয় নি। যেই চোখজোড়ার দৃষ্টি ওই আলখেল্লায় পড়েছিল ওই চোখগুলার মায়া কাঁটিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি তার। মেয়েটিকে যেহেতু সে নিশিতে দেখেছে তাই মনে মনে আগেই নামটি ঠিক করে ফেলেছে। হু নিশি কন্যা। ইংরেজীতে Nocturnal Girl.... গার্ল বললে একটু কেমন জানি লাগে, তাই নংচার্নাল লেডি বলটাই ভাল৷
..
..
ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে যেয়েও নিশি কন্যা দিতে পারে নি। তার আগেই ফারাবী ওকে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে। হু ছেলেটির নাম ফারাবী। ঝাঁপ দিতে যেয়েও যখন পারলো না তখন পিছনে ব্যর্থ আর বিরক্তিমাখা দৃষ্টি নিয়ে ফিরলো নিশি কন্যা। ও একটুও অবাক হয় নি। তারপর আরো কঠোর দৃষ্টিতে ফারাবীর দিকে তাকালো। বলল,
-কি, সমস্যা কি আপনার?
-নাহ্ কই না তো, আমার কোনো সমস্যা নাই। (এখনো হাত ছাড়ে নি)
-তবে আমার হাত ধরেছেন কেন?
-ছাড়তে ইচ্ছা হয় নি তাই ধরেছি
-আজব তো। আপনার ইচ্ছা দিয়ে আমি কি করবো? আমার কাছে আমার ইচ্ছার মূল্যই সবচেয়ে বেশি।
-ঠাসসসসস্স
ওর গালে একটা চড় পড়লো। হু চড়টি ফারাবীই দিয়েছে। এবার ও কঠোর দৃষ্টি নিয়ে বলল,
-মরতে যাচ্ছিলেন কেন? (নিশি কন্যার মুখে কোনো কথা নাই)
-এইযে নিশি কন্যা কি হয়েছে, কথা বলছেন না কেন?
-আপনি আমাকে চড় দিলেন কেন? (এবার কেন জানি মেয়েটির চোখগুলো দেখতে অসম্ভব রকমের মায়াবী লাগছিল)
-সেটা আপনি জানেন। এভাবে সুইসাইড করতে গিয়েছিলেন কেন?
-........
(কথার কোনো জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে ফেলছে)
-এই যে মিস নিশি কন্যা, বোবা হয়ে গেলেন নাকি?
-...... (এবারো কোনো কথা নাই)
-শুনেন আপনি হয়তবা কোনো না কোনো ব্যর্থতার জন্য নিজেকে শেষ করে ফেলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন এই ব্যর্থতাই আপনাকে পথ দেখাবে, জীবনে ঠিকভাবে চলতে শেখাবে। এটা জীবনেরই একটি অংশ। এই পৃথিবীতে সফলতা অর্জন করতে গেলে যেটা প্রথম দরকার সেটা হচ্ছে বেঁচে থাকা। আর তারপর আপনি চিন্তা করবেন যে কীভাবে ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায়। (ফারাবী একটানে কথাগুলো বলে)
-আমার নাম অনামিকা৷ নিশি কন্যা না।
কি বললো আর কি উত্তর পেলো। যাক, কথা তো বলছে এটাই অনেক। ফারাবী কিছু বলতে যাবে এমন সময় ও আবার বললো,
-কিভাবে বাঁচতে হয় আমি জানি না। এই দুনিয়ায় আমার কেউ নাই।
-হু সুন্দর নাম। কিন্তু আমি আপনাকে নিশি কন্যা বলেই ডাকবো। আর হ্যা কেউ হয়তবা নাই কিন্তু কেউ আসতে তো পারে। সেটার জন্য দরকার অপেক্ষা। অপেক্ষা করুন যখন সময় হবে তখন ঠিকই কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেন।
বলেই ফারাবী ছাদ থেকে নেমে চলে আসলো। ও আর পিছনে তাকায় নি কারণ সে জানে এখন আর মেয়েটি আত্নহননের চেষ্টা করবে না। পরে নিশি কন্যাও চলে আসে।
..
..
পরদিন আবার একই সময়ে জোৎস্না দেখতে ফারাবী ছাদে যায়। গিয়ে দেখে নিশি কন্যা আগে থেকেই দাঁড়ানো। তো ওর উদ্দেশ্যে বললো,
-কি ব্যাপার, আজকে সুইসাইড করবেন না?
-নাহ্। (ফারাবীর দিকে ফিরে )
-হাহাহা কেন? (ফারাবী একটু হেসে বলে)
-সেটা আপনি জানেন।
-আমার উত্তর আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন। যাইহোক আপনাকে আজকে অনেক ভাল লাগছে দেখতে। ইউ লুক রিয়্যালি ফ্যানটাস্টিক। সবসময় এভাবে থাকবেন।
-থ্যংকস ফর ইউর কম্পলিমেন্ট। আচ্ছা আপনি কি প্রতিদিনই জোৎস্না দেখতে আসেন? (উৎসুক হয়ে জানতে চাইল অনামিকা)
-হু, এটা আমার নেশা হয়ে গেছে। জোৎস্না দেখতেই হয়।
-আমিও এখন থেকে প্রতিদিন জোৎস্না দেখতে আসব। তাতে কি আপনার কোনো সমস্যা হবে?
-হু হবে। জোৎস্না একা দেখতেই ভালো লাগে।
-ও আচ্ছা। তবে যাই।
নিশি কন্যা মন খারাপ করে চলে যাচ্ছে এমন সময় ফারাবী একটু জোরে বললো,
-কিন্তু সাথে কেউ থাকলে জোৎস্নাটা দেখতে আরো অনেক বেশি ভালো লাগে।
এবার ও এদিক ফিরে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
-নাহ থাক, চলেই যাই।
তখন ওর ওই হাসিটা চাঁদের অালোয় অপরূপ লাগছিল৷ যেন সব অালো এসে তার হাসির কাছে ধরা দিয়েছে৷ ওই হাসিতে মুগ্ধ হয়েই ফারাবী আবার বললো,
-নাহ তুমার নাম কিন্তু নিশি কন্যা। সো নিশি উপলব্ধি করাটাই তোমার কাম্য৷ (তুমি করেই বলল)
-হিহিহি আচ্ছা (অাবারো একটা ভুবন ভুলানো হাসি)
.
.
এভাবেই সারাটি রাত ওরা গল্প করে কাঁটিয়ে দিত। নিশি কন্যার পরিবারে কেউ নেই। এখানে একা থাকে। ও যখন খুব ছোট তখনই ওর বাবা-মা একটা এক্সিডেন্টে মারা যায়। ওর আর কোনো ভাই-বোন ছিল না। মেয়েটি অনেক কষ্টে বড় হয়েছে।
..
..
এমন করেই তাদের প্রতিটা রাত খুব সুন্দর করে চলে যেত। টেরই পেত না যে কিভাবে সময় চলে যাচ্ছে। দুজন দুজনকে অনেক ভালবাসে। সেটা মুখের ভাষায় বলা হয় নি কিন্তু দুজনই মনের ভাষায় সব বুঝিয়ে দিত। এখন একটা ভালবাসার সফল পরিণতি দরকার। ফারাবী চাইলো সে নিশি কন্যাকে আরো গভীরভাবে তার মত করে ভালবাসবে। সে জানে নিশি কন্যাও তাকে অনেক ভালবাসে। তাই আজকে হঠাৎ বললো,
-নিশি কন্যা?
-হু বলো?
-আমি তোমার আপন হতে চাই
-হু তুমি তো আমার আপনই।
-নাহ তার চাইতেও অনেক বেশি আপন হতে চাই। সারাটি জীবন তোমার হাত ধরে থাকতে চাই। উইল ইউ মেরি মি?
-.......... (কিছু বললো না)
-কি হল?
এবার হঠাৎ করেই নিশি কন্যা কাঁদতে শুরু করলো।
অনেক কাঁদছে। এটা দেখে ফারাবী বলে,
-এই তুমি কাঁদছো কেন, আমাকে তোমার পছন্দ হয় নি তাই বলে কাঁদতে হবে? আজব তো, প্লিজ কান্না.......
কথা শেষ হবার আগেই নিশি কন্যা এসে ফারাবীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কান্নার তীব্রতা আরো বাড়িয়ে বলে,
-আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। আমার কেউ নেই। এখন শুধুমাত্র তুমিই আছো। অনেক ভালবাসি ফারাবী তোমাকে, অনেক। তোমাকে কখনো হারাতে চাই না, প্লিজ আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না। তবে আর আমার বাঁচার কোনো স্বাদ থাকবে না।
ফারাবীও নিশি কন্যাকে তার শক্ত বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বলে,
-কখনো না। কখনোই তোমাকে হারাতে দিব না।
..
..
হু এভাবেই তাদের নতুন সম্পর্কের শুরু হয়েছিল।
কিন্তু তিন মাস পর একদিন হঠাৎ করেই কেন জানি নিশি কন্যার মাথায় প্রচুর ব্যথা শুরু হয়। (প্রায় সময়ই হতো যদিও ওইদিন ব্যথার পরিমাণটা অনেক বেশি ছিল কিন্তু সে এটা ফারাবীর সাথে কখনো শেয়ার করে নি।) ওকে ডাক্তার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে বল, ওর নাকি ব্রেইনে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তাকে আর বেশিদিন বাঁচানো সম্ভব না। যদি আরো আগে জিনিসটা ধরা পড়তো তবে কিছু একটা করা যেত। কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই।
..
..
সেদিন কথাগুলো শুনে ফারাবীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। তার চোখের সামনে তার প্রিয়তমা তাকে ছেড়ে চলে যাবে আর এটা তার চোখ বুজে সহ্য করতে হবে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। ওর জন্য সে নিজের হ্রৎপিন্ডটা দিতেও রাজি আছে। কিন্তু যেভাবেই হোক নিশি কন্যাকে তার বাঁচাতেই হবে। একদিন সে নিজেই মরতে চাইছিলো কিন্তু ফারাবীই সেদিন তাকে বাঁচতে শিখিয়েছে, আর আজ যখন মেয়েটি তার সাথে নিজেকে বেঁধে রাখতে চাচ্ছে তখন কি তার কিছুই করার নেই???
জগৎটা এত নিষ্ঠুর কেন?
..
..
..
আর হল না। একমাস মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে সে আর পারে নি। চলে গেছে না ফেরার দেশে। ও চলে যাওয়ার পর খুব করে কেঁদেছিল ফারাবী, পাগলের মত কেঁদেছিল। সেও অনেকবার চেয়েছিল ওই না ফেরার দেশে যেতে কিন্তু পারে নি। কারণ নিশি কন্যাকে সে কথা দিয়েছিলো যে নিজের প্রতি খেয়াল রাখবে। নিজেকে ঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখবে।
...
...
হু আর তাই এখনো ফারাবী নিজের খেয়াল রাখছে। তাকে যে বেঁচে থাকতেই হবে কারণ সে বেঁচে না থাকলে তো আর তার ভালবাসাও বেঁচে থাকবে না। তার ভালবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও তাকে বেঁচে থাকতে হবে। এখনো সে জোৎস্না দেখতে আসে, জোৎস্নার মাঝেই তার নিশি কন্যাকে খুঁজে। কিন্তু নিশি কন্যাতো ওই না ফেরার দেশে চলে গেছে। আর আসবে না। তবুও ফারাবী অপেক্ষায় থাকে, তার ভালবাসার অপেক্ষায়। এ এক অন্তীম অপেক্ষা, যেটা কখনো শেষ হবার নয়।
-
-
লেখকের কিছু কথাঃ লিখাটি যদি কারো জীবনের সাথে মিলে যায় তবে অামি দায়ী নই৷ অামি অামার কল্পনা থেকেই এটা লিখেছি৷
-
-
-
লিখা- Farabi Tahmid (ওয়ানকাইন্ড অফ ফাজিল পুলা)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন